টালিউডে বাংলা সিনেমায় সম্পর্কের গল্প নতুন নয়। তবে সেই সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা না বলা অনুভূতি, স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা আকাঙ্ক্ষা এবং অভিমানের নানা রূপকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়েছে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ‘অভিমান’। এ সিনেমা অনেকটাই আলাদা। কারণ সম্পর্ক, স্মৃতি আর না বলা অনুভূতির জটিল সুরে মুগ্ধতার পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রেখে যায় বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলি আর যিশু সেনগুপ্তের সিনেমা।
সিনেমাটি একদিকে যেমন প্রেম, একাকিত্ব ও স্মৃতির আবহে মোড়া, ঠিক তেমনই রহস্যের আবরণও বজায় রাখে শেষ পর্যন্ত। গল্পের কেন্দ্রে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আকাশ চট্টোপাধ্যায়। চরিত্রটিকে নিজের অভিজ্ঞতা ও পরিণত অভিনয় দিয়ে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন প্রসেনজিৎ। সংলাপের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে তার চোখ, নীরবতা কিংবা মুখের অভিব্যক্তি। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা যেন এ চরিত্রে আরও একবার নতুনভাবে ধরা দিলেন। কিছু দৃশ্যে তিনি এতটাই স্বাভাবিক যে, চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা মুছে যেতে থাকে।
অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলি এ সিনেমায় অন্যতম বড় প্রাপ্তি। তার চরিত্রে যেমন কোমলতা রয়েছে, ঠিক তেমনই রয়েছে মানসিক টানাপোড়েন। সংযত অভিনয়ে তিনি গল্পের আবেগকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। আর অভিনেতা যিশু সেনগুপ্তও নিজের চরিত্রে যথাযথ। তার উপস্থিতি সিনেমার রহস্য ও আবেগ— দুইকেই সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়। আরেক অভিনেত্রী সোহিনী সরকারের জন্য খুব বড় পরিসর না থাকলেও স্বল্প উপস্থিতিতেই নজর কাড়েন তিনি।
পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত ‘অভিমান’ সিনেমাটিকে শুধু গল্পের মধ্যে আটকে রাখেননি। দৃশ্য বিন্যাস, আলো-আঁধারির ব্যবহার এবং আবহসংগীত এ সিনেমাকে এক ধরনের কাব্যিক মাত্রা দিয়েছে। প্রতীপ মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা এ সিনেমার আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে কিছু ক্লোজআপ ও নীরব মুহূর্ত দীর্ঘদিন মনে থেকে যাওয়ার মতো। সংলাপেও রয়েছে আলাদা মাত্রা। সম্পর্কের জটিলতা কিংবা অভিমানের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ভাষার মাধ্যমে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে ছবির আবেগ দর্শকদের কাছে সহজেই পৌঁছে যায়।
তবে এ সিনেমার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সিনেমার গতি অনেক সময়ে ধীর হয়েছে, যা দর্শকদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারে। কয়েকটি দৃশ্যে প্রতীকী উপস্থাপনা এতটাই বেশি যে সাধারণ দর্শকের কাছে তা কিছুটা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। পাশাপাশি দ্বিতীয়ার্ধে রহস্যের স্তর বজায় রাখার চেষ্টায় কিছু অংশ অপ্রয়োজনীয় ভাবে দীর্ঘ বলে মনে হয়।
তবু ‘অভিমান’ সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি তার আবেগ। এখানে সম্পর্কের কোনো সরল সমীকরণ নেই, আছে মানুষ আর তার মনের নানা স্তর। ছবিটি উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন বেশি ছুড়ে দেয়, আর সেই কারণেই হয়তো শেষ দৃশ্যের পরেও ছবির আবেশ থেকে যায়। বাণিজ্যিক বিনোদনের ভিড়ে ‘অভিমান’ নিঃসন্দেহে অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা। সব দর্শকের জন্য না হলেও, যারা ধীর ছন্দের, আবেগপ্রধান এবং শিল্পসম্মত গল্প দেখতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে এ সিনেমা দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো হয়ে উঠতে পারে।


